
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে শনিবার (স্থানীয় সময়) বড় পরিসরের একটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এই অভিযানের পর দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতিতে ট্রাম্প এসব কথা জানান।
ট্রাম্প তাঁর পোস্টে বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা ও দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে একটি সফল ও বৃহৎ সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। এই অভিযানে মাদুরোকে তাঁর স্ত্রীসহ আটক করা হয়েছে এবং তাঁকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।” তবে মাদুরোকে কীভাবে আটক করা হয়েছে, কোন স্থানে বা কোন পরিস্থিতিতে তাঁকে ধরা হয়েছে এবং বর্তমানে তাঁকে কোথায় রাখা হয়েছে—এসব বিষয়ে তিনি কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেননি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও বলেন, এই অভিযান মার্কিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিশেষ বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত হয়েছে। তিনি জানান, অভিযানের বিস্তারিত তথ্য পরবর্তী সময়ে প্রকাশ করা হবে। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে অবহিত করতে আজ শনিবার সকাল ১১টায় (মার্কিন স্থানীয় সময়) ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমে এ দাবি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিবিসির যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অংশীদার সিবিএস নিউজকে একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে মার্কিন সেনাবাহিনীর অভিজাত বিশেষ বাহিনী ডেল্টা ফোর্স আটক করেছে। সিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেল্টা ফোর্স হলো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গোপন ও দক্ষ সন্ত্রাস দমন ইউনিটগুলোর একটি, যারা সাধারণত উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অভিযানে অংশ নেয়। তবে ভেনেজুয়েলা সরকার তাৎক্ষণিকভাবে মাদুরোকে আটক করার বিষয়টি নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি।
ভেনেজুয়েলার ভেতরেও পরিস্থিতি ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ। শনিবার স্থানীয় সময় রাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দে অনেক মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। রাজধানী কারাকাসে অবস্থানরত সিএনএনের সাংবাদিক ওসমারি হার্নান্দেজ জানান, একটি বিস্ফোরণ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তার প্রভাবে তাঁর বাসার জানালার কাচ কেঁপে উঠছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার ভোরের দিকে কারাকাসে একের পর এক বিকট শব্দ, যুদ্ধবিমানের গর্জন এবং আকাশে উড়োজাহাজের চলাচল দেখা গেছে। একই সময়ে শহরের বিভিন্ন অংশে আকাশে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। বিশেষ করে শহরের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত একটি বড় সামরিক ঘাঁটির আশপাশে বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
কারাকাসে থাকা সিএনএনের একাধিক সাংবাদিক জানান, বিস্ফোরণের পরপরই আকাশে বিমানের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তবে এসব বিস্ফোরণের সঠিক কারণ বা লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রাতের অন্ধকারে শহরের আলোঝলমলের মধ্যে আকাশে দুটি বড় ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে। একটি কুণ্ডলীর নিচে কমলা রঙের আভা ও আগুনের ঝলকানি দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর অন্য একটি স্থানে তীব্র আলোর ঝলকানির সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দ শোনা যায়।
সিবিএস নিউজকে ভেনেজুয়েলায় থাকা একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাজধানী কারাকাসে বিস্ফোরণ ও বিমান চলাচলের খবর সম্পর্কে ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা অবগত রয়েছেন। তাদের দাবি, ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই ভেনেজুয়েলার সামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় হামলার নির্দেশ দিয়েছেন।
অন্যদিকে রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে সত্যিই হামলা চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে কয়েক মাস ধরে যে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল, তারই ধারাবাহিকতায় এই হামলার ঘটনা ঘটেছে।
ভেনেজুয়েলা সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, শুধু কারাকাস নয়, দেশটির মিরান্ডা, আরাগুয়া ও লা গুয়াইরা রাজ্যেও হামলা হয়েছে। এসব ঘটনার পর প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো দেশজুড়ে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশ দেন।
রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা যায়, শনিবার ভোর রাত ২টা থেকে প্রায় ৯০ মিনিট ধরে কারাকাসজুড়ে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ সময় শহরের আকাশে একাধিক সামরিক বিমান উড়তে দেখা যায় এবং হামলা থামার পরও আকাশে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। পুরো পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।