
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ঘোষিত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক আজ সমাপ্ত হয়েছে। এই শোকাবহ সময়ে বাংলাদেশের জনগণসহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী, সহমর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের পক্ষ থেকে যে অকুণ্ঠ ভালোবাসা, গভীর সমবেদনা এবং আন্তরিক দোয়া আমাদের পরিবার পেয়েছে, তা আমাদের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে এবং আবেগে আপ্লুত করেছে।
এই তিনটি দিনে আমরা নতুন করে উপলব্ধি করেছি—আমার মা বেগম খালেদা জিয়া ভিন্ন ভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্ন ভিন্ন তাৎপর্য বহন করতেন। কারও কাছে তিনি ছিলেন আপসহীন নেতৃত্বের প্রতীক, কারও কাছে গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অবিচল প্রেরণা, আবার কারও কাছে ছিলেন সাহস, আত্মমর্যাদা ও নৈতিক দৃঢ়তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অনেক ক্ষেত্রেই এই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার গভীরতা এতটাই ব্যাপক ও অর্থবহ ছিল যে, হয়তো আমরা পরিবার হিসেবেও তার পুরো ব্যাপ্তি আগে সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারিনি।
অনেক মানুষের কাছে তিনি ছিলেন অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার প্রতিচ্ছবি—নিজ বিশ্বাস ও আদর্শের পক্ষে দৃঢ়চিত্তে দাঁড়িয়ে থাকার অনুপ্রেরণা। রাজনীতির সীমানা অতিক্রম করে এই প্রেরণা সমাজের নানা স্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরিচয়, মতাদর্শ কিংবা অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি অগণিত মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন—যা এই শোকের সময়ে আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার উপদেষ্টা পরিষদের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। তাদের দূরদর্শী নেতৃত্ব, আন্তরিকতা ও দ্রুত সমন্বয়ের ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই এমন একটি বিরল, সুশৃঙ্খল ও সম্মানজনক অন্তিম আয়োজন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে, যা জাতির জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আমাদের প্রতিবেশী ও বন্ধু রাষ্ট্রসমূহ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, রাজনৈতিক নেতা, কূটনীতিকবৃন্দ এবং বৈশ্বিক অংশীদারদের প্রতি আমরা গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। দেশ-বিদেশের নেতৃবৃন্দের সহমর্মিতা, সংহতি ও সমবেদনার বার্তা আমাদের হৃদয়কে গভীরভাবে আন্দোলিত করেছে এবং এই শোকের সময়ে আমাদের মানসিক শক্তি জুগিয়েছে।
জানাজায় বিভিন্ন দেশের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি, সমবেদনার চিঠি ও বার্তা, শোক বইয়ে লেখা আবেগঘন কথাগুলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের অকৃত্রিম অনুভূতির প্রকাশ, বাংলাদেশে অবস্থানরত বিভিন্ন মিশন ও প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি—এই প্রতিটি সম্মান ও শ্রদ্ধাই ছিল অভূতপূর্ব এবং আমাদের পরিবারের জন্য গভীরভাবে স্মরণীয়।
আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি কর্মকর্তা ও সদস্যকে। মায়ের শেষ বিদায়ের প্রতিটি মুহূর্তে আপনাদের পেশাদারিত্ব, দায়িত্ববোধ ও আন্তরিক শ্রদ্ধা জিয়া পরিবারকে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করেছে।
এই শোকের দিনগুলো যেন মর্যাদা, শৃঙ্খলা ও সম্মানের সঙ্গে সম্পন্ন হয়, সে জন্য যারা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের সবার প্রতিই আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টকে। তাদের সম্মানসূচক গার্ড অব অনার ও শেষ সালাম আমার মায়ের জীবন, সংগ্রাম ও অবদানের প্রতি জাতির পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। সমাধিস্থল পর্যন্ত তাকে পৌঁছে দিয়ে তারা জাতির ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক হয়ে উঠেছেন এবং তার অন্তিম যাত্রাকে যথাযথ মর্যাদায় আলোকিত করেছেন।
এ কথাও গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করতে চাই—আরও অসংখ্য মানুষ ছিলেন, যাদের নাম বা ভূমিকা হয়তো আলাদাভাবে উল্লেখ করা সম্ভব হয়নি, কিন্তু তারা নীরবে, নিরলসভাবে ও নিষ্ঠার সঙ্গে এই পুরো প্রক্রিয়াকে সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে সহায়তা করেছেন। পর্দার আড়ালে কিংবা জনসম্মুখের বাইরে থেকে দায়িত্ব পালনকারী সবার প্রতিই আমাদের আন্তরিক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা রইল। আলহামদুলিল্লাহ, আপনাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই আমাদের পরিবার ও জাতি মর্যাদার সঙ্গে মায়ের স্মৃতিকে ধারণ করতে পেরেছে।
সবশেষে, বাংলাদেশের জনগণের প্রতি জানাই আমার গভীর অভিবাদন ও কৃতজ্ঞতা। দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ একত্রিত হয়ে দেশনেত্রীর প্রতি যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিবেদন করেছেন, সেই দৃশ্য আমাদের পরিবার কখনোই ভুলবে না। এই ঐক্যবদ্ধ ও আবেগঘন উপস্থিতি প্রমাণ করে—বাংলাদেশের গণমানুষের হৃদয়ে সহমর্মিতা, মানবিকতা ও কৃতজ্ঞতার শক্ত ভিত্তি আজও অটুট।
আমাদের পরিবার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির পক্ষ থেকে, এই শোক ও স্মরণের সময়ে যারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সহানুভূতি ও ভালোবাসা জানিয়েছেন, তাদের সবাইকে আবারও জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। আপনাদের এই ভালোবাসা, সংহতি ও দোয়া আমাদের জন্য সান্ত্বনা ও শক্তির উৎস হয়ে থাকবে, আর আমরা তা কৃতজ্ঞচিত্তে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে বহন করে চলব—ইনশাআল্লাহ।