অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ক্রীড়াঙ্গন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি দাবি করেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) নিরাপত্তা বিভাগ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) একটি চিঠি দিয়েছে, যেখানে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের জন্য সম্ভাব্য তিনটি নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরপরই বিষয়টি গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
তবে আসিফ নজরুলের এই বক্তব্যের পর দ্রুতই বিষয়টি পরিষ্কার করতে এগিয়ে আসে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। বিসিবি এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ক্রীড়া উপদেষ্টা যে চিঠির কথা উল্লেখ করেছেন, সেটি আইসিসির পক্ষ থেকে বিসিবিকে পাঠানো কোনো আনুষ্ঠানিক বা সরাসরি চিঠি নয়। বরং এটি ছিল আইসিসির অভ্যন্তরীণ একটি আন্তঃবিভাগীয় নথি বা নোট, যা মূলত সামগ্রিক হুমকি মূল্যায়নের অংশ হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে। এই নথি কোনো দেশের বোর্ডের উদ্দেশে পাঠানো হয়নি এবং এটি আইসিসির চূড়ান্ত বা প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানকেও প্রতিফলিত করে না বলে বিসিবি স্পষ্ট করে জানায়।
এর আগে প্রধান উপদেষ্টার উপ প্রেস সচিব আজাদ মজুমদারও একই ধরনের ব্যাখ্যা দেন। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, ক্রীড়া উপদেষ্টা যে চিঠির কথা উল্লেখ করেছেন, সেটি আসলে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্লেষণের জন্য আইসিসির একটি অভ্যন্তরীণ নথি। এটি বাংলাদেশ দলের ম্যাচ ভারতের বাইরে আয়োজনের বিষয়ে বিসিবির আবেদনের প্রেক্ষিতে আইসিসির কোনো সরাসরি বা আনুষ্ঠানিক জবাব নয়। তাঁর বক্তব্যেও বিষয়টি পরিষ্কার হয় যে, আইসিসির পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা অবস্থান জানানো হয়নি।
বিসিবি সূত্র আরও জানায়, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে যে চিঠি তারা আইসিসিকে পাঠিয়েছিল, সে বিষয়ে এখনো আইসিসির কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগ বা অন্য কোনো সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে বিসিবির কাছে নতুন কোনো ই-মেইল বা চিঠিও পাঠানো হয়নি বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ পুরো বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসেনি।
উল্লেখ্য, এর আগে সোমবার বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। সেখানে তিনি বলেন, আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগ তাদের নথিতে তিনটি কারণ উল্লেখ করেছে, যেগুলোর ফলে ভারতে বিশ্বকাপে অংশ নিলে বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশ দলে তারকা পেসার মুস্তাফিজুর রহমানের অন্তর্ভুক্তি। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ দলের সমর্থকেরা দলীয় জার্সি পরে প্রকাশ্যে চলাফেরা করলে তা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আর তৃতীয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই নাকি দলের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে।
এই তিনটি কারণ নিয়েই ক্রীড়া উপদেষ্টা তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি এসব যুক্তিকে অবাস্তব, অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, আইসিসি যদি মনে করে বিশ্বকাপ খেলতে গেলে বাংলাদেশ দলকে তাদের সেরা বোলারকে বাদ দিতে হবে, সমর্থকদের জার্সি পরা থেকে বিরত থাকতে হবে অথবা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজনের সুবিধার্থে একটি সার্বভৌম দেশের জাতীয় নির্বাচন পিছিয়ে দিতে হবে, তাহলে সেটি কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা হতে পারে না। তিনি বলেন, এসব শর্ত ক্রিকেটের চেতনা, ক্রীড়াঙ্গনের স্বাভাবিক নিয়ম এবং একটি স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
আসিফ নজরুল আরও দাবি করেন, এই বিষয়গুলো থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে ভারতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা বাংলাদেশের জন্য ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে মুস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে যে নিরাপত্তা ইস্যু উত্থাপন করা হয়েছে এবং যেভাবে আইসিসির অভ্যন্তরীণ নথিতে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক একটি বার্তা বহন করে। তাঁর মতে, এসব যুক্তি দেখিয়ে যদি বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশগ্রহণ নিয়েও নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এদিকে বিসিবি জানিয়েছে, তারা এখনো আইসিসির আনুষ্ঠানিক অবস্থানের অপেক্ষায় রয়েছে। আইসিসির পক্ষ থেকে স্পষ্ট ও লিখিত জবাব পাওয়ার পরই বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে। বোর্ডের মতে, গুজব বা অপূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়। তাই আইসিসির চূড়ান্ত অবস্থান না জানা পর্যন্ত তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং বাংলাদেশের ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
উপদেষ্টা: এ্যাড. এনামুল হক এনাম সম্পাদক : মোঃ শামীম আহমেদ অফিসঃ ১৫০ নাহার ম্যানসন (৫ম তলা) মতিঝিল বানিজ্যিক এলাকা,ঢাকা -১০০০। খন্দকার এন্টারপ্রাইজ লি. এর পক্ষে কেএম সবুজ কর্তৃক প্রকাশিত। মোবাইল নং : ০১৭১৫-৬২৭৮৯৪ , ০১৭৮৪-৮৩৮৬৮০ ই-মেইল: news@dhakabani.com
প্রকাশিত সংবাদপত্রের অংশ