
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকার ভোটকেন্দ্রগুলোতে নজিরবিহীন ও বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে ঢাকা মহানগরের মোট ২ হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় প্রায় ২৫ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভোটগ্রহণের দিন সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য রাজধানীর চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপন করা হচ্ছে বিশেষ কন্ট্রোল রুম, যেখান থেকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রস্তুতিমূলক পরিকল্পনা অনুযায়ী, সম্ভাব্য ঝুঁকি ও অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে রাজধানীর ভোটকেন্দ্রগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে—‘গুরুত্বপূর্ণ’ ও ‘সাধারণ’ কেন্দ্র। এর মধ্যে ঢাকায় ১ হাজার ৮২৮টি কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বাকি ৩০৩টি কেন্দ্র সাধারণ কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত। গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে তিনজন করে অস্ত্রধারী পুলিশ সদস্য সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন। সাধারণ কেন্দ্রগুলোতে অস্ত্রসহ দুজন পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। কোনো একটি ভেন্যুতে একাধিক ভোটকেন্দ্র থাকলে সেখানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বিবেচনায় পাঁচজন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিটি পুলিশ সদস্যের কাছেই থাকবে আগ্নেয়াস্ত্র।
পুলিশের পাশাপাশি প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে আনসার বাহিনীর সদস্যরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। কেন্দ্রপ্রতি ১০ জন আনসার সদস্য দায়িত্বে থাকবেন এবং তাঁদের নেতৃত্বে সহকারী সেকশন কমান্ডার পদমর্যাদার একজন আনসার সদস্য অস্ত্রসহ নিয়োজিত থাকবেন। এ ছাড়া প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একজন অতিরিক্ত অস্ত্রধারী আনসার সদস্য থাকবেন।
নির্বাচন উপলক্ষে নিরাপত্তা প্রস্তুতি, পুলিশ মোতায়েন, যানবাহন ব্যবস্থাপনা ও সামগ্রিক সমন্বয় নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের সদর দপ্তরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে ডিএমপির আটটি অপরাধ বিভাগের উপকমিশনার, ট্রাফিক বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং র্যাবের একজন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। বৈঠকে ভোটের দিন দায়িত্ব বণ্টন, কেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা ঝুঁকি, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, জাতীয় নির্বাচনে ঢাকার ভোটকেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের একটি বড় অংশ রাজধানীতেই অবস্থান করবেন। একই সঙ্গে দেশি ও বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিও ঢাকায় তুলনামূলকভাবে বেশি থাকবে। ফলে নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে—সে মূল্যায়ন অনেকাংশেই ঢাকার সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। এ কারণেই রাজধানীর প্রতিটি ভোটকেন্দ্রকে ঘিরে কঠোর ও স্তরভিত্তিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে।
নির্বাচনী সামগ্রী সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য ঢাকার ১৫টি স্থানে বিশেষ ভেন্যু নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব স্থান থেকে ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্সসহ প্রয়োজনীয় সব সামগ্রী ভোটকেন্দ্রে পাঠানো হবে এবং ভোটগ্রহণ শেষে পুনরায় সেখানে ফিরিয়ে আনা হবে। এ কাজে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সামগ্রী ও পুলিশ সদস্য পরিবহনের জন্য প্রায় তিন হাজার যানবাহন রিকুইজেশন করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ভোটের দিন নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে থাকবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কোনো প্রার্থী, প্রার্থীর কর্মী বা সমর্থকরা আচরণবিধি ভঙ্গ করলে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।ভোটকেন্দ্রের বাইরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করবে র্যাব। ডিএমপির প্রতিটি অপরাধ বিভাগে র্যাবের ছয়টি করে দল মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি মাঠে থাকবে পুলিশের মোবাইল টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্স, যারা যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) এস এন নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভোটকেন্দ্রে পুলিশ মোতায়েন, যানবাহনের প্রয়োজনীয়তা এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিকল্পনাই ছিল এই সমন্বয় বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয়।এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা টানা সাত দিন মাঠে থাকবেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্র অনুযায়ী, আগামী ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও ভিডিপি এবং কোস্টগার্ড একযোগে দায়িত্ব পালন করবে।
ডিএমপির সূত্র জানায়, রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, মিরপুর পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট কার্যালয়, গুলশান কূটনৈতিক এলাকা ও উত্তরা এলাকায় চারটি কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিএমপির আটটি অপরাধ বিভাগে থাকবে আটটি সাব-কন্ট্রোল রুম, যেখান থেকে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, তথ্য আদান–প্রদান এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজধানীতে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।