বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৮:০২ অপরাহ্ন

উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ শেষ, চলছে গণনা

স্টাফ রিপোর্টার
                                             
  •   Update Time : বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৮k Time View  
  •                                      
                                   
                               

সারা দেশে উৎসবমুখর, শান্তিপূর্ণ ও ব্যাপক জনসম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একইসঙ্গে বহুল আলোচিত ঐতিহাসিক সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত গণভোট। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত কোনো বিরতি ছাড়াই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই দেশজুড়ে কেন্দ্রভিত্তিক ভোট গণনা শুরু হয়েছে, যা চলছে গভীর রাত পর্যন্ত।

ভোটের দিন ভোরের আলো ফোটার আগেই দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রের সামনে ভোটারদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। অনেক কেন্দ্রে ফজরের নামাজের পর থেকেই ভোটাররা লাইনে দাঁড়াতে শুরু করেন। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ভিড় রূপ নেয় দীর্ঘ সারিতে। নারী, পুরুষ, তরুণ, প্রবীণ—সব বয়সী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে অধিকাংশ কেন্দ্রেই এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। অনেক ভোটার জাতীয় উৎসবের আমেজে পরিবার-পরিজন নিয়ে ভোটকেন্দ্রে আসেন, আবার কেউ কেউ প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের সঙ্গে দলবদ্ধভাবে ভোট দিতে উপস্থিত হন।

রাজধানী ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের জেলা ও উপজেলা শহরগুলোতে সকাল থেকেই ভোটারদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা যায়। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে তরুণ ভোটারদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। গ্রামাঞ্চলেও ভোটারদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল, যা সাম্প্রতিক সময়ের নির্বাচনের তুলনায় ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দুপুর ২টা পর্যন্ত সারাদেশে ভোট পড়েছে ৪৭ দশমিক ৯১ শতাংশ। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই তথ্য জানান ইসি সচিব আখতার আহমেদ। তিনি বলেন, ভোটগ্রহণের শেষ পর্যন্ত এই হার আরও বাড়বে বলে কমিশন আশাবাদী।

ইসি সচিব আরও জানান, দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ সার্বিকভাবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগ পাওয়া গেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। বড় ধরনের কোনো সহিংসতা, প্রাণহানি বা গুরুতর অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি বলে কমিশন দাবি করেছে।

এবারের নির্বাচন ভোটারদের জন্য ছিল সম্পূর্ণ নতুন ও ব্যতিক্রমধর্মী এক অভিজ্ঞতা। সংসদ সদস্য নির্বাচনের পাশাপাশি ভোটাররা প্রথমবারের মতো সংবিধানের আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ‘জুলাই সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়নের প্রশ্নে গণভোটে অংশ নেন। এই গণভোটে ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট প্রদানের সুযোগ ছিল, যা অনেক ভোটারের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ ও কৌতূহল সৃষ্টি করে। সকাল থেকেই অধিকাংশ কেন্দ্রে ব্যালট গ্রহণে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা গেছে ভোটারদের।

ভোটকেন্দ্রগুলোতে নারী ও প্রবীণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। অনেক বয়স্ক ভোটারকে স্বজনদের সহায়তায় কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেখা যায়। তরুণ ভোটারদের মধ্যে ভোটকে ঘিরে উচ্ছ্বাস ও আলোচনা ছিল বেশি, যদিও সকালের দিকে মধ্যবয়সী ভোটারদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি লক্ষ্য করা গেছে।

নিরাপত্তার প্রশ্নে নির্বাচন কমিশন ছিল কঠোর। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং আনসারের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী দায়িত্ব পালন করে। পাশাপাশি মোবাইল টিম ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের তৎপরতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রার্থীদের নির্বাচনী বুথগুলোতে রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি থাকলেও কোথাও বড় ধরনের সংঘাত বা উত্তেজনার খবর পাওয়া যায়নি।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ওই আসনের নির্বাচন স্থগিত করা হয়। ফলে এবারের নির্বাচনে মোট ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব আসনে মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৩ জন ভোটার ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ছিলেন ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন এবং নারী ভোটার ছিলেন ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন।

সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে মোট ৫০টি রাজনৈতিক দল। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২৮ জন, যার মধ্যে ১ হাজার ৭৫৫ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী এবং ২৭৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।সব মিলিয়ে, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত গণভোট দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে বলে অভিমত বিশ্লেষকদের।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025 dailydhakabani
themesba-lates1749691102