
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বিএনপি রাষ্ট্র মেরামতের একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক রূপরেখা জাতির সামনে উপস্থাপন করেছিল। তিনি জানান, অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল এবং সারাদেশের জনগণের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময়, আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতেই ৩১ দফা প্রণয়ন করা হয়। এই ৩১ দফাকে ভিত্তি করেই বিএনপির দলীয় ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট সংযুক্ত করে বিএনপি জুলাই সনদেও স্বাক্ষর করেছে। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, বিএনপি জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—জনগণের প্রত্যাশিত প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
শনিবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল-এর বলরুমে আয়োজিত নির্বাচন-পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।বক্তব্যের শুরুতে তারেক রহমান বলেন, দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণ আবারও বিএনপিকে বিজয়ী করেছে—আলহামদুলিল্লাহ। তিনি বলেন, “এ বিজয় কোনো একক দলের নয়; এ বিজয় বাংলাদেশের, এ বিজয় গণতন্ত্রের, এ বিজয় গণতন্ত্রকামী জনগণের। আজ থেকে আমরা সবাই স্বাধীন।” তিনি দেশের জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, সব প্রতিবন্ধকতা, ভয়ভীতি ও প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেই জনগণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছেন।
তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর করে দেওয়া সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই নতুন বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে। এই কঠিন বাস্তবতায় দেশ পুনর্গঠনের কাজ সহজ হবে না, তবে জনগণের ঐক্য ও গণতান্ত্রিক শক্তির ওপর ভর করেই বিএনপি সামনে এগোবে।তিনি আরও বলেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফলে দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর দেশে পুনরায় জনগণের সরাসরি ভোটে জবাবদিহিমূলক সংসদ ও সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। ভবিষ্যতে যেন কোনো অপশক্তি দেশে আবারও ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে না পারে কিংবা দেশকে কোনো তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, সে জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদ সহ মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। অংশগ্রহণকারী প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে তিনি আন্তরিক অভিনন্দন জানান। তার ভাষায়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোই গণতন্ত্রের মূল বাতিঘর। সরকার ও বিরোধীদল নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে দেশেই গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।তিনি বলেন, “আমাদের পথ ও মত ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক।” জাতীয় ঐক্যকে শক্তি এবং বিভাজনকে দুর্বলতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশ গঠনে অংশগ্রহণকারী সব দলের চিন্তাভাবনাই বিএনপির কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তারেক রহমান বলেন, জনমনে সৃষ্ট সব সংশয় কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত দেশে শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ জন্য তিনি অন্তর্বর্তী সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, গণতন্ত্রের ইতিহাসে এই অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলন পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছেন—তাদের সবার প্রতি তিনি গভীর শ্রদ্ধা জানান। মহান আল্লাহর দরবারে তিনি তাঁদের মাগফেরাত কামনা করেন এবং বলেন, গণতন্ত্রকামী জনগণ তাঁদের ত্যাগ চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
এই আনন্দঘন মুহূর্তে আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া-এর অনুপস্থিতির কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এটি আমাদের সবাইকে ভারাক্রান্ত করে। জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় তিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপোষহীন লড়াই করেছিলেন এবং কখনো স্বৈরাচার বা অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করেননি। তিনি মরহুম খালেদা জিয়ার মাগফেরাত কামনা করেন।বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শত নির্যাতন ও নিপীড়নের মধ্যেও আপনারা রাজপথ ছাড়েননি, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবিচল ছিলেন। এখন দেশ গড়ার পালা। দেশ পুনর্গঠনের এই যাত্রায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।সবশেষে তারেক রহমান নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে বলেন, কোনো উস্কানির মুখেও যেন কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। কোনো অন্যায় বা বেআইনি কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ বা ভিন্নমত নির্বিশেষে আইনের চোখে সবাই সমান। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই হবে নতুন বাংলাদেশের মূল ভিত্তি।