পুলিশের সঙ্গে জনগণের তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের ‘আস্থার সংকট’ দূর করতে দেশের প্রতিটি জেলার সদর থানাকে ধীরে ধীরে ‘জিরো কমপ্লেইন’ থানায় পরিণত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ পুলিশের নবনিযুক্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেছেন, পুলিশ এমনভাবে জনগণকে সেবা দিতে চায় যাতে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযোগ না থাকে এবং মানুষ থানায় গিয়ে ভোগান্তির পরিবর্তে দ্রুত ও কার্যকর সেবা পায়।
সোমবার (৯ মার্চ) সকালে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর মো. আলী হোসেন ফকিরকে দেশের পুলিশ প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমের সামনে এসে তিনি পুলিশের কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন।
আইজিপি বলেন, জনগণের আস্থা অর্জন করা পুলিশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বিভিন্ন ঘটনার কারণে পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর অভিযোগে পুলিশের প্রতি মানুষের মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পুলিশের পক্ষ থেকে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
তিনি বলেন, “আমরা চাই প্রতিটি জেলা সদর থানাকে ‘জিরো কমপ্লেইন’ থানা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। অর্থাৎ থানায় গিয়ে কেউ যেন কোনো ধরনের হয়রানি বা অভিযোগের সম্মুখীন না হন। মানুষ যেন হাসিমুখে থানায় আসতে পারে এবং সেবা নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যেতে পারে—সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।”
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি জেলা সদর থানার কার্যক্রম সার্বক্ষণিকভাবে তদারকির জন্য একজন সার্কেল এএসপি (সহকারী পুলিশ সুপার) দায়িত্বে থাকবেন বলে জানান তিনি। থানায় দায়ের হওয়া অভিযোগ, তদন্তের অগ্রগতি এবং সেবার মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে পুলিশের ‘রিঅ্যাকশন টাইম’ বা কোনো ঘটনার পর দ্রুত সাড়া দেওয়ার সময়ও কমিয়ে আনার পরিকল্পনার কথা বলেন আইজিপি।
আইজিপি আরও জানান, থানায় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়ার একটি পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে থানায় অভিযোগ নিয়ে গেলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পাওয়া সাপেক্ষে দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে। এতে ভুক্তভোগীরা দীর্ঘসূত্রতা ছাড়াই দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ পাবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তদন্তের মান উন্নয়নকে পুলিশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা চাই মামলার তদন্ত আরও দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন হোক। এজন্য তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হবে।” তিনি আরও বলেন, অপরাধ তদন্তে দক্ষতা বাড়াতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)কে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরে আইজিপি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক বিবেচনার সুযোগ থাকবে না। তিনি বলেন, “চাঁদাবাজি একটি গুরুতর অপরাধ। দল-মত নির্বিশেষে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘ব্লক রেইড’ পরিচালনার মাধ্যমে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে এবং এই অভিযান চলমান থাকবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ কোনো ধরনের অপরাধের সঙ্গে আপস করবে না বলেও তিনি জানান।
নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ ও গণধর্ষণের মতো চাঞ্চল্যকর অপরাধের ঘটনায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আইজিপি বলেন, এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবে এবং দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনার জন্য বিশেষ নজরদারি রাখা হবে।
আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানান পুলিশপ্রধান। তিনি বলেন, ঈদে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সড়ক, মহাসড়ক, নৌপথ ও রেলপথে নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। মহাসড়কে ডাকাতি, ছিনতাই বা চাঁদাবাজি ঠেকাতে হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশকেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি র্যাব সদস্যরাও গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথে নিরাপত্তা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে।
তিনি আরও জানান, রাজধানীসহ দেশের প্রধান প্রধান বিপণিবিতান ও মার্কেটে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, যাতে ঈদকে কেন্দ্র করে কেনাকাটায় আসা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় এবং চুরি-ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।
ঈদের সময় পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে প্রায়ই অসন্তোষ তৈরি হয়—এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পুলিশ বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানান আইজিপি। তিনি বলেন, যেসব গার্মেন্টস কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের সম্ভাবনা রয়েছে সেগুলো আগে থেকেই চিহ্নিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি শ্রমিক নেতা, কারখানার মালিক, বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশে উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর উত্থান ঠেকাতে পুলিশ সর্বদা সজাগ থাকবে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হবে এবং যেকোনো ধরনের জঙ্গিবাদী তৎপরতা কঠোরভাবে দমন করা হবে।
সবশেষে আইজিপি বলেন, জনগণই রাষ্ট্রের মূল শক্তি এবং পুলিশের মূল দায়িত্ব হলো জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাই জনগণের সঙ্গে সমন্বয় ও আস্থা তৈরি করেই পুলিশকে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, “আমরা একটি জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে চাই। জনগণের পাশে থেকে তাদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়াই আমাদের অঙ্গীকার।”
উপদেষ্টা: এ্যাড. এনামুল হক এনাম সম্পাদক : মোঃ শামীম আহমেদ অফিসঃ ১৫০ নাহার ম্যানসন (৫ম তলা) মতিঝিল বানিজ্যিক এলাকা,ঢাকা -১০০০। খন্দকার এন্টারপ্রাইজ লি. এর পক্ষে কেএম সবুজ কর্তৃক প্রকাশিত। মোবাইল নং : ০১৭১৫-৬২৭৮৯৪ , ০১৭৮৪-৮৩৮৬৮০ ই-মেইল: news@dhakabani.com
প্রকাশিত সংবাদপত্রের অংশ