
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। তাই দেশের উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে নারীদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, “এই অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে যদি আমরা পেছনে রেখে দিই, তাদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে কোনোভাবেই দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।”
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বনানীতে কড়াইল বস্তিসংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি মাঠে আয়োজিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেশের ১৪টি স্থানে একযোগে এই কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নারী ও শিশু এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
বক্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়কার বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তখন তিনি নারীদের শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিশেষ করে স্কুল থেকে শুরু করে ইন্টারমিডিয়েট পর্যায় পর্যন্ত নারীদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেই উদ্যোগের ফলে দেশে একটি শিক্ষিত নারী সমাজ গড়ে উঠেছে। এখন সেই শিক্ষিত নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও ক্ষমতায়িত করাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, “আমরা চাই নারীরা শুধু শিক্ষিতই হবেন না, তারা অর্থনৈতিকভাবেও শক্তিশালী হবেন। তাদের জীবনমান উন্নত হবে এবং পরিবার ও সমাজে তাদের ভূমিকা আরও দৃঢ় হবে। সেই লক্ষ্য থেকেই সরকার নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তারই একটি অংশ হিসেবে আজ থেকে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হচ্ছে।”
প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের ১৪টি উপজেলা বা এলাকায় এই কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এই মুহূর্তে প্রায় ৩৭ হাজার নারী এই কর্মসূচির আওতায় আসছেন। এর মধ্যে রাজধানীর কড়াইল, ভাষানটেক এবং সাততলা—এই তিনটি এলাকায় প্রায় ১৫ হাজার নারীকে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে।
সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, দেশে প্রায় চার কোটি পরিবার রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সেই চার কোটি পরিবারের মধ্যে যেসব পরিবার নারীপ্রধান, তাদের প্রত্যেকের কাছেই ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তিনি বলেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সরকার ধাপে ধাপে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে।”
তিনি আরও বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি কোনো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফল। এই কর্মসূচি চালুর দিনটিকে তিনি নিজের সরকার এবং বিএনপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ, স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক দিন হিসেবে উল্লেখ করেন। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “আজকের এই অনুষ্ঠানটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, স্মরণীয় এবং ঐতিহাসিক একটি দিন।”
দায়িত্বশীল সরকারের ভূমিকা পালনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের জন্য কাজ করতে চায় এবং দেশের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে চায়। তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি সরকার গড়ে তুলতে চাই, যে সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে এবং দেশের স্বার্থে কাজ করবে।”
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি জনগণের কাছে যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে সরকার। জনগণের সমর্থনে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।ফ্যামিলি কার্ড ছাড়াও কৃষকদের সহায়তার জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামী মাসের মধ্যেই অনেক কৃষকের হাতে এই কার্ড তুলে দেওয়া সম্ভব হবে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষকদের কৃষিঋণ মওকুফের বিষয়েও তিনি কথা বলেন। তারেক রহমান জানান, যেসব কৃষকের কৃষিঋণ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ছিল, সেই ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা কৃষক ভাইদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম—যাদের কৃষিঋণ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত রয়েছে, আমরা সেই ঋণ সুদসহ মওকুফ করব। গত সপ্তাহেই সেই ঋণ মওকুফ করা হয়েছে।”
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালুর দিনটি ব্যক্তিগতভাবেও তার জন্য আবেগঘন বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং সুযোগ পেলে এটি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ছিল। অবশেষে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ পেয়েছে বলে তিনি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানান।
সমসাময়িক বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিলম্ব হতে পারে বলে উল্লেখ করেন। তবে তিনি আশ্বাস দেন, সরকার তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে একটুও সরে যাবে না। তিনি বলেন, দেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি, সরকার সেই প্রত্যাশা পূরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে তিনি সবাইকে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার আহ্বান জানান।
বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি তার নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহৃত স্লোগানটির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, প্রতিটি নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্যের শেষে তিনি একটি ছোট স্লোগান বলতেন, যা এখন সারা দেশের মানুষের কাছে পরিচিত। সেই স্লোগান দিয়েই তিনি বক্তব্য শেষ করেন—
“করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। সবার আগে বাংলাদেশ।”
এর আগে সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে রাজধানীর বনানীতে টিঅ্যান্ডটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। মঞ্চে ওঠার আগে তিনি সরাসরি মাঠে অপেক্ষমাণ নারীদের কাছে চলে যান এবং তাদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে নারীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন এবং বিভিন্ন স্লোগান দেন। দেশের প্রধানমন্ত্রীকে এত কাছ থেকে দেখে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।