আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, উজান থেকে নেমে আসা অতিরিক্ত পানি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং একই সঙ্গে বন্যার ক্ষতিও কমানো সম্ভব হবে।সোমবার (১৬ মার্চ) দুপুরে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুর মৌজার সাহাপাড়ায় খাল খনন কার্যক্রমের উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, উজান থেকে যখন হঠাৎ করে প্রচুর পানি নেমে আসে, তখন নদী তীরবর্তী মানুষের ঘরবাড়ি, গবাদিপশু ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। অনেক সময় গ্রামাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং কৃষিজমিও পানির নিচে তলিয়ে যায়। তাই খালগুলো পুনঃখননের মাধ্যমে বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধরে রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে যেমন বন্যার ঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে সেই পানি শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে ব্যবহার করা যাবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা বিদেশ থেকে আমদানি করে পূরণ করা সম্ভব নয়। এজন্য দেশের কৃষি উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা এবং মাটির উর্বরতা বজায় রেখে কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল করতে হবে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করাও জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তারেক রহমান বলেন, “কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। অনেক খাল ও নদী দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে বন্যা হলেও শুষ্ক মৌসুমে আবার খরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। আমরা চাই বর্ষার পানিকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে সারা বছর কৃষির কাজে ব্যবহার করতে।”
তিনি জানান, সরকারের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সারা দেশে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ৪ কোটি পরিবারের কাছে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে, যাতে সাধারণ মানুষ বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা ও সেবার আওতায় আসতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আগামী মাস থেকে দেশের ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও মধ্যম পর্যায়ের কৃষকদের মধ্যে কৃষক কার্ড বিতরণ করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা সহজে সরকারি ভর্তুকি, কৃষিঋণ এবং কৃষি সহায়তা পেতে পারবেন। তিনি বলেন, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কৃষকদের সবসময় বন্ধু হিসেবে পাশে ছিলেন। আমরাও কৃষকদের পাশে থাকতে চাই এবং তাদের শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চাই।”
তিনি মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, সেখানে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেক শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এতে দেশের অর্থনীতিতেও চাপ পড়ছে। সরকার তাদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়ে চিন্তা করছে।
দিনাজপুরের সাহাপাড়া খাল খনন প্রকল্প সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই খালের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ কিলোমিটার। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে প্রায় ৩১ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। এই খাল থেকে পানি নিয়ে প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে। এতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ বিভিন্নভাবে সুবিধা পাবেন। কৃষি উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
তিনি জানান, খালটি সম্পূর্ণ খনন শেষ হলে এই এলাকার কৃষকরা বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৬০ হাজার টন ফসল উৎপাদন করতে পারবেন। এছাড়া খালের দুই পাশে রাস্তা নির্মাণ করা হবে এবং পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রায় ১০ হাজার গাছ লাগানো হবে। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে তিনি আবারও এলাকা পরিদর্শনে আসবেন বলে জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, উত্তরাঞ্চল মূলত কৃষিনির্ভর এলাকা। তাই এই অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার তৈরি হবে এবং কৃষকদের সন্তানদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি বলেন, “১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। আর ২০২৪ সালে সাধারণ মানুষ ও ছাত্রসমাজ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে। এখন আমাদের দায়িত্ব দেশকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া।”
তিনি আরও বলেন, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একসময় দেশের খাদ্য উৎপাদন চাহিদার দ্বিগুণে উন্নীত করেছিলেন এবং বিদেশেও খাদ্য রপ্তানি করেছিলেন। সেই ধারা বজায় রাখতে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। তবে একই সঙ্গে সজাগ থাকতে হবে—কারা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায় তা নজরে রাখতে হবে।”
তারেক রহমান বলেন, দেশের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে কাজ করা কোনো এক ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি বলেন, “নির্বাচনে আপনারা আমাদের সমর্থন দিয়েছেন বলেই আমরা সরকার গঠন করতে পেরেছি। আপনাদের সমর্থন ছাড়া দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। জনগণই সব ক্ষমতার উৎস এবং এই দেশের প্রকৃত মালিক।”
দিনাজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মোফাজ্জল হোসেন দুলালের সভাপতিত্বে এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার আহমেদ কচির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, সমাজকল্যাণ ও নারী ও শিশু বিষয়কমন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, দিনাজপুর-৪ আসনের এমপি ও জাতীয় সংসদের হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়া, দিনাজপুর-১ আসনের এমপি মনজুরুল ইসলাম, দিনাজপুর-২ আসনের এমপি সাদিক রিয়াজ চৌধুরী পিনাক এবং দিনাজপুর-৩ আসনের এমপি সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম।
এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কাহারোল উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম মোস্তফা, সাধারণ সম্পাদক আলারুল ইসলাম এবং প্রচার সম্পাদক বাবু চৌধুরী। অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কৃষক, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
উপদেষ্টা: এ্যাড. এনামুল হক এনাম সম্পাদক: মোঃ শামীম আহমেদ অফিসঃ ১৫০ নাহার ম্যানসন (৫ম তলা) মতিঝিল বানিজ্যিক এলাকা,ঢাকা-১০০০।খন্দকার এন্টারপ্রাইজ লি. এর পক্ষে কেএম সবুজ কর্তৃক প্রকাশিত।মোবাইল নং: ০১৭১৫-৬২৭৮৯৪, ০১৭৮৪-৮৩৮৬৮০ (বার্তাকক্ষ) ০১৯৯৯-৬৫২৩০৩ ই-মেইল: dailydhakabani@gmail.com
প্রকাশিত সংবাদপত্রের অংশ