গত ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের ফলে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।তিনি বলেন, অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, হুন্ডি প্রবাহ ও অর্থ পাচারের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রপ্তানি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে আমদানি প্রবৃদ্ধি কমেছে এবং প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিনে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, সামাজিক খাত এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থার একটি সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন।তিনি জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.১৭ শতাংশ। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ৪.২২ শতাংশে এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয় ৯.৭৩ শতাংশ। শিল্প ও কৃষি—উভয় খাতেই প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তিনি বলেন, শিল্পখাত দুর্বল হয়ে পড়ায় কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে এবং তরুণরা বাধ্য হয়ে কৃষিখাতে বেশি যুক্ত হয়েছে, যার ফলে ছদ্ম-বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে কৃষিখাত জাতীয় আয়ের মাত্র ১১.৬ শতাংশ যোগ করলেও প্রায় ৪১ শতাংশ কর্মসংস্থান এই খাতেই কেন্দ্রীভূত, যা নিম্ন উৎপাদনশীলতার ইঙ্গিত দেয়।সঞ্চয় ও বিনিয়োগের ভারসাম্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। ২০০৫-০৬ সালে যেখানে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ প্রায় সমান্তরাল ছিল, সেখানে ২০২৩-২৪ সালে বিনিয়োগ সঞ্চয়ের তুলনায় বেশি হওয়ায় বৈদেশিক নির্ভরতা বেড়েছে।টাকার অবমূল্যায়নের বিষয়েও তিনি বলেন, ২০০৫-০৬ সালে প্রতি ডলার ছিল ৬৭.২ টাকা, যা ২০২৪-২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২১ টাকায়। এতে আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।রাজস্ব ও ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, রাজস্ব বৃদ্ধি পেলেও জিডিপির অনুপাতে তা স্থির রয়েছে, কিন্তু ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজেট ঘাটতি বেড়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পে অতিমূল্যায়ন ও দুর্নীতির কারণে জনগণ প্রত্যাশিত সুফল পায়নি।
ঋণ ব্যবস্থাপনায়ও অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে এবং সুদ পরিশোধের পরিমাণ ১৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাজেটে বড় চাপ সৃষ্টি করছে।ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে তিনি বলেন, খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ২০.২০ শতাংশে পৌঁছেছে এবং মূলধন পর্যাপ্ততা কমে গেছে, যা খাতটির দুর্বলতা নির্দেশ করে।সামাজিক সূচকে বৈষম্য বৃদ্ধির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, জিনি সহগ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ধনী-গরিবের ব্যবধান অনেক বেড়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোও পর্যাপ্ত কার্যকর হয়নি।অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, প্রশাসন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রাজস্ব ব্যবস্থা ও তথ্য ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিনের দুর্বলতা তৈরি হয়েছে, যা নীতিনির্ধারণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।বর্তমান সরকার এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজস্ব সংস্কার, ঋণ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং পুঁজিবাজার শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করাও সরকারের অগ্রাধিকার।তিনি আশা প্রকাশ করেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
উপদেষ্টা: এ্যাড. এনামুল হক এনাম সম্পাদক: মোঃ শামীম আহমেদ অফিসঃ ১৫০ নাহার ম্যানসন (৫ম তলা) মতিঝিল বানিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০। খন্দকার এন্টারপ্রাইজ লি. এর পক্ষে কেএম সবুজ কর্তৃক প্রকাশিত। মোবাইল নং: ০১৭১৫-৬২৭৮৯৪, ০১৭৮৪-৮৩৮৬৮০ (বার্তাকক্ষ) ০১৯৯৯-৬৫২৩০৩ ই-মেইল: dailydhakabani@gmail.com
প্রকাশিত সংবাদপত্রের অংশ