রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:৩১ অপরাহ্ন

জামায়াত-এনসিপির জোট নির্বাচন বর্জন করছে!

নিজস্ব প্রতিবেদক
                                             
  •   Update Time : শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১৩k Time View  
  •                                      
                                   
                               

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ধারাবাহিক অভিযোগে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে জোটের শরিক দলগুলো। অভিযোগের মাত্রা ও ধারাবাহিকতা বাড়তে থাকায় রাজনৈতিক মহলে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—শেষ পর্যন্ত কি এই জোট নির্বাচন বর্জনের পথে হাঁটতে পারে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ-উর রহমান মনে করেন, নির্বাচন বর্জনের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, যদিও এটি এখনো চূড়ান্ত বা নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাঁর মতে, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা পার হয়ে প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন হলেও কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট চাইলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিতে পারে। অতীতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত ও এনসিপির পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ তোলা হচ্ছে যে, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন কার্যত বিএনপির পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। নির্বাচন কমিশনে গিয়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. আব্দুল্লাহ মো. তাহের সাংবাদিকদের বলেন, প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে এমন বক্তব্য শোনা যাচ্ছে, যেখানে প্রকাশ্যেই বলা হচ্ছে—তারেক রহমানকে ক্ষমতায় বসানোই যেন এখন মূল লক্ষ্য। এ ধরনের মন্তব্য রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।

জাহেদ-উর রহমানের বিশ্লেষণে, এসব অভিযোগের পেছনে মূলত দুই ধরনের কৌশলগত উদ্দেশ্য থাকতে পারে। প্রথমত, এটি হতে পারে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ সৃষ্টি করার একটি রাজনৈতিক কৌশল, যা গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখা যায়। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে নির্বাচন বর্জনের যৌক্তিকতা তৈরির প্রস্তুতিও এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হতে পারে। তাঁর ভাষায়, “যদি ধারাবাহিকভাবে বলা হয় যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই, তাহলে একপর্যায়ে বলা সহজ হয়ে যায়—এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আর কোনো অর্থ নেই।”

তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচনী পরিবেশ অতীতের তুলনায় অনেক বেশি ভারসাম্যহীন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ১৯৯১, ১৯৯৬ কিংবা ২০০১ সালের নির্বাচনগুলোতে তুলনামূলকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল। কিন্তু এবারের ক্ষেত্রে অনেক আগেই রাজনৈতিক সমীকরণ স্পষ্ট হয়ে গেছে যে বিএনপি বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। তাঁর মতে, “বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে খুব কম ক্ষেত্রেই এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে, যেখানে ভোটের আগেই বিজয়ী পক্ষ এতটা নিশ্চিতভাবে অনুমান করা যায়।”

এই বিশ্লেষকের আশঙ্কা, এমন নিশ্চিত বিজয়ের ধারণা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গণমাধ্যমের একটি অংশকে তথাকথিত ‘সূর্যমুখী প্রবণতা’র দিকে ঠেলে দিতে পারে। অর্থাৎ, সম্ভাব্য ক্ষমতাকেন্দ্রের দিকে স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকে পড়ার মানসিকতা তৈরি হতে পারে। এই প্রবণতা নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সুষ্ঠু পরিবেশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।

জামায়াত-এনসিপি জোটের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো প্রত্যাশার তুলনায় কম আসন পাওয়ার সম্ভাবনা। জাহেদ-উর রহমান বলেন, যদি জোটটি বুঝতে পারে যে তারা এক-তৃতীয়াংশ বা এমনকি এক-চতুর্থাংশ আসনের কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারবে না, তাহলে সংসদের ভেতরে কিংবা বাইরে কার্যকর বিরোধী রাজনীতি করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। এর ফলে দলের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং সমর্থকদের মনোবলেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে তিনি মনে করেন, নির্বাচন বর্জনের হুমকি জোটের জন্য একটি ‘আলটিমেট বার্গেইনিং টুল’ হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক দরকষাকষির শেষ অস্ত্র হিসেবে বর্জনের বিষয়টি সামনে আনা হতে পারে। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, নির্বাচনকে যদি অতিরিক্ত অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে দেশ একটি অজানা ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে এগিয়ে যেতে পারে, যার পরিণতি শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের জন্যই সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে জাহেদ-উর রহমান বলেন, তাদের অংশগ্রহণের ফলে নির্বাচনকে পুরোপুরি একতরফা বলে চিহ্নিত করা কিছুটা কঠিন হবে। যদিও এটিকে সম্পূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন বলার সুযোগও সীমিত থাকবে। তবুও জাতীয় পার্টির উপস্থিতি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও অংশগ্রহণমূলক চরিত্রকে কিছুটা হলেও বাড়াতে পারে।

সবশেষে জাহেদ-উর রহমান আহ্বান জানান, সম্ভাব্য রাজনৈতিক ফলাফল অনুকূলে না আসার আশঙ্কায় যেন কোনো দল নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ায়। তাঁর মতে, বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক নতুন কিছু নয়—এমনকি তুলনামূলক ভালো নির্বাচনগুলোর ক্ষেত্রেও এ ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। সেই বাস্তবতা মেনেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া এবং রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়াই দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025 dailydhakabani
themesba-lates1749691102