
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত সময়েই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে—এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান যে একেবারেই অনড়, তা আবারও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, নির্বাচন পেছানো বা এগিয়ে আনার কোনো প্রশ্নই নেই এবং নির্ধারিত তারিখেই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) রাতে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক দুই জ্যেষ্ঠ মার্কিন কূটনীতিক—আলবার্ট গম্বিস ও মোর্স ট্যান—এর সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই ঘোষণা দেন প্রধান উপদেষ্টা। বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন,
“কে কী বলল, তাতে আমাদের কিছু আসে-যায় না। ১২ ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে—একদিন আগেও না, একদিন পরেও না।”
তার এই বক্তব্যে সরকারের দৃঢ় সংকল্প ও আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পরদিন বুধবার দুপুরে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বৈঠকের বিস্তারিত তথ্য সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। তিনি জানান, বৈঠককালে অধ্যাপক ইউনূস বিদেশি প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করে বলেন যে, আসন্ন নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ। ভোটগ্রহণ যেন উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়, সে লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে এবং সব রাজনৈতিক দলের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’, অর্থাৎ সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, নির্বাচনকে ঘিরে একটি স্বার্থান্বেষী মহল ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এবং ভুয়া খবর ও অপপ্রচারের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। তবে এসব অপপ্রচারে সরকার বিচলিত নয়। তিনি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে, সকল ষড়যন্ত্র ও গুজব উপেক্ষা করেই সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নির্বাচন সম্পন্ন করবে এবং ফলাফল ঘোষণার পর জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা শান্তিপূর্ণভাবে হস্তান্তর করা হবে।
প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জুলাই সনদ, রোহিঙ্গা সংকট, এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচার নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। প্রধান উপদেষ্টা জানান, সরকার আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচার চালাচ্ছে। কারণ জনগণের সরাসরি সমর্থনে অনুমোদিত ‘জুলাই সনদ’ ভবিষ্যতে দেশে যেকোনো ধরনের স্বৈরশাসনের পথ স্থায়ীভাবে রুদ্ধ করবে এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাবেক স্বৈরাচারী শাসনের সমর্থকরা এখন এআই-নির্মিত ভুয়া ভিডিও, বিকৃত তথ্য ও অপতথ্য ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তবে সাধারণ মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়েছে এবং তারা এসব কৃত্রিম প্রোপাগান্ডা শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সাবেক মার্কিন কূটনীতিক আলবার্ট গম্বিস ও একমত পোষণ করে বলেন, ভুয়া খবর ও বিভ্রান্তিকর তথ্য বর্তমানে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের জন্য অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধিরা দক্ষিণ আফ্রিকার আদলে বাংলাদেশে একটি ‘সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন’ গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুললে প্রধান উপদেষ্টা স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশে এর জন্য এখনো উপযুক্ত সময় আসেনি। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সত্য ও পুনর্মিলন তখনই কার্যকর হয় যখন অপরাধীরা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে অনুশোচনা প্রকাশ করে। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত বর্বর অপরাধের বিপুল প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পতিত সরকারের সমর্থকরা এখনো নিহত তরুণদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দিচ্ছে এবং সম্পূর্ণ অস্বীকারের অবস্থান নিয়েই রয়েছে।
এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার এসডিজি বিষয়ক সমন্বয়ক ও সিনিয়র সচিব লামিয়া মোর্শেদ ও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকটি বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক রূপান্তর, গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।