
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখন পর্যন্ত বেসরকারিভাবে ২৯৭টি আসনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২০৯টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জয় পেয়েছে ৬৮টি আসনে। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছয়টি আসনে বিজয় অর্জন করেছে। বাকি আসনগুলোতে স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ছোট দলের প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আজ অথবা আগামীকালের মধ্যেই সরকারি ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হতে পারে। গেজেট প্রকাশের পরপরই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। প্রাথমিক আলোচনা অনুযায়ী, আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হতে পারে। শপথ পড়ানোর ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি কিংবা রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
শপথ ও সরকার গঠনের সম্ভাব্য সময়সূচি
শপথগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পর ১৭ বা ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়া দলকে সরকার গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানাবেন। সে অনুযায়ী, বিজয়ী দল বিএনপিই নতুন সরকার গঠন করবে—এটি কার্যত নিশ্চিত।
নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন বলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সূত্রগুলো জোরালোভাবে জানাচ্ছে। বিএনপির সংসদীয় দলের নেতা হিসেবেও তাঁর নাম চূড়ান্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বঙ্গভবন ও প্রশাসনের প্রস্তুতি
শপথ ও মন্ত্রিসভা গঠনের পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবে বঙ্গভবন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং সরকারি পরিবহন অধিদপ্তর। জানা গেছে, নতুন প্রধানমন্ত্রী ও সম্ভাব্য মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য আলাদা আলাদা ফাইল প্রস্তুতের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। বিজয়ী দলের পক্ষ থেকে মন্ত্রী হওয়ার জন্য মনোনীতদের নামের তালিকা পাঠানো হবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। সেই অনুযায়ী যাচাই-বাছাই শেষে ফাইলগুলো বঙ্গভবনে পাঠানো হবে।
শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ। এ ছাড়া নবনিযুক্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের টেলিফোনে আমন্ত্রণ জানানো, তাঁদের বাসার ঠিকানা সংগ্রহ করা এবং নির্ধারিত সময়ে সরকারি গাড়ি পাঠানোর মতো প্রশাসনিক কাজগুলোও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকেই সম্পন্ন করতে হবে।
প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদলের ইঙ্গিত
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই জনপ্রশাসনে বড় ধরনের পুনর্গঠন ও রদবদল আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। গত ১৭ বছরে যাঁরা সৎ, দক্ষ ও অভিজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে উপেক্ষিত ছিলেন, তাঁদের সমন্বয়ে একটি যুগোপযোগী ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলার কথা ভাবছে নতুন সরকার।
সূত্র জানায়, বিগত দেড় বছরে প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা প্রভাবশালী কিছু কর্মকর্তার কর্মকাণ্ড ইতিমধ্যেই খতিয়ে দেখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ প্রকাশ্যে বিএনপির প্রতি সমর্থন দেখালেও বাস্তবে ভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্বার্থে কাজ করেছেন। এ ধরনের কর্মকর্তাদের কম গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বদলি করা হতে পারে। রোজা ও ঈদের পর মাঠ প্রশাসনে—বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে—বড় ধরনের রদবদল আসতে পারে বলেও আভাস মিলেছে।
উপদেষ্টা ও সচিবালয়ের প্রস্তুতি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের বেশির ভাগ উপদেষ্টা ইতিমধ্যেই কূটনৈতিক (লাল) পাসপোর্ট ও সরকারি বাসা ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁদের ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) ও সহকারী ব্যক্তিগত সচিবরাও (এপিএস) প্রয়োজনীয় নথিপত্র গুছিয়ে নিচ্ছেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব বাসা ও দপ্তরের দায়িত্ব নেবেন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা।
নতুন মন্ত্রীরা দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী নিজ নিজ মন্ত্রণালয় ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেবেন। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ—মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে—উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।
বিএনপির প্রশাসনিক টিম ও অতীত অভিযোগ
বিএনপির চেয়ারম্যান ও সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন বিসিএস ১৯৮২ ব্যাচের সাবেক সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার। তিনি প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া-রও পিএস ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই কয়েকজন সাবেক আমলা প্রশাসনিক বিষয়গুলো দেখভাল করছেন।
এই দলের উদ্যোগে গঠিত ‘বৈষম্যবিরোধী কর্মকর্তা-কর্মচারী ফোরাম’ অতীতে একাধিকবার অভিযোগ করেছিল যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পদোন্নতি ও পদায়নের মাধ্যমে একটি ‘দলদাস আমলাতন্ত্র’ তৈরি করা হয়েছিল। তাঁরা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা একাধিক সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছিলেন। নির্বাচনের আগে কয়েকজন জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) প্রত্যাহারের দাবিও ওঠে, যদিও তৎকালীন সরকার তা আমলে নেয়নি।
বিএনপি সরকার গঠনের পর এসব অভিযোগের আলোকে প্রশাসনে থাকা পক্ষপাতদুষ্ট কর্মকর্তাদের সরিয়ে অতীতে বঞ্চিত ও দলনিরপেক্ষ অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে প্রশাসনের ভেতরে তথাকথিত ‘বর্ণচোরা’ কর্মকর্তাদের মধ্যে বদলি আতঙ্ক বিরাজ করছে। কেউ কেউ নতুন করে বিএনপি সমর্থক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন বলেও আলোচনা চলছে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনের গেজেট প্রকাশ, সংসদ সদস্যদের শপথ, নতুন সরকার ও মন্ত্রিসভা গঠন এবং প্রশাসনে সম্ভাব্য বড় রদবদল—এই কয়েক দিনের মধ্যেই দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।