
ছেলে-মেয়েকে ডাক্তার বানিয়ে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করতে চেয়েছিলেন সাভারের পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রের (সিআরপি) সিনিয়র অকুপেশনাল থেরাপিস্ট আয়েশা আক্তার সোমা। তবে ফেরি দুর্ঘটনায় আয়েশা আক্তার ও তার আট মাস বয়সের ছেলে আরসানের লাশ উদ্ধারের পর সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।রাতে বাস উদ্ধারের পর পদ্মা নদীর পৃথক স্থান থেকে ডুবুরি দল তাদের লাশ দুটি উদ্ধার করে। পরে বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) দুপুরে সাভারের পাথালিয়া ইউনিয়নের গকুলনগর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে মা-ছেলের জানাজা শেষে দাফন করা হয়।
এর আগে, বুধবার (২৫ মার্চ) দৌলতদিয়া ফেরীঘাটে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাস পদ্মা নদীতে ডুবে গেলে দিবাগত রাত ১২টার সময় মা আয়েশা আক্তার ও ভোর ৪ টার সময় ছেলে আরসানের লাশ উদ্ধার করা হয়। স্বামী-সন্তান সহ আয়েশা আক্তার বসবাস করতেন আশুলিয়ার নয়ারহাট সংলগ্ন পাল পাড়ায়।সিআরপি সূত্রে জানা গেছে, পক্ষাঘাতগ্রস্থদের পুনর্বাসন কেন্দ্রের (সিআরপি) বিএইচপিআই ফিজিওথেরাপি বিভাগের ১৫তম ব্যাচের নুরুজ্জামানের স্ত্রী অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের ১৭তম ব্যাচের ছাত্রী ছিল আয়েশা আক্তার সোমা। আয়েশা আক্তার সোমা প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র অকুপেশনাল থেরাপিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
আয়েশা আক্তার সোমার স্বপ্ন ছিল ছেলে-মেয়েকে ডাক্তারিবিদ্যা শিখিয়ে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করার। কিন্ত সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল। এক মুহূর্তেই তার সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল। বুধবার দৌলতদিয়া ফেরীঘাটে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাস পদ্মা নদীতে ডুবে যাওয়ায় কোলের আট মাস বয়সের শিশু সন্তান সহ তার মৃত্যু হয়। পরে মধ্যরাতে বাস উদ্ধারের পর মা-ছেলের লাশ উদ্ধার করে ডুবুরি দল।সিআরপি সূত্র আরো জানায়, ঈদের ছুটিতে একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত স্বামী সিনিয়র ফিজিওথেরাপিস্ট নুরুজ্জামানের বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানার খন্দকবাড়িয়া গ্রামে বেড়াতে গিয়েছিল আয়েশা আক্তার। লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে সিআরপির একটি প্রতিনিধি দল অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ গ্রহণ করে। পরে বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন করে।
নিহত সোমার স্বামী নুরুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার পথে ঘটনার আগ মুহূর্তে বড় বাচ্চা নওরিনকে নদী দেখাতে বাস থেকে নিচে নামেন তিনি। এ সময় স্ত্রী সোমা আট মাস বয়সী ছেলে আরসানকে নিয়ে বাসে বসেছিলেন। তিনি নেমে যাওয়ার পর মুহূর্তে থেমে থাকা বাসটি চালু করার পর চালক কিছুতেই থামাতে পারছিলেন না। চোখের সামনেই ফেরী থেকে বাসটি নদীর গভীর পানিতে নিমজ্জিত হয়। এ সময় বেশ কয়েকজন বের হয়ে এলেও আমার কলিজার টুকরো সন্তান সহ স্ত্রী বাসের মধ্যেই মারা যায়। মধ্যরাতে বাস উদ্ধারের পর তাদের উভয়ের লাশ পৃথক স্থান থেকে ডুবুরি দল উদ্ধার করে।
তিনি আরো জানান, সোমার বাবা নাসির উদ্দিনের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলায়। সোমা তার নানাবাড়ি সাভারের পাথালিয়া ইউনিয়নের গকুলনগর গ্রামেই বেড়ে ওঠেন। এখানকার স্কুল-কলেজে তার লেখাপড়া শেষে সিআরপিতে বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশন্স ইনস্টিটিউটে অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগে লেখাপড়া করেন। পরে সিআরপিতেই অকুপেশনাল থেরাপিস্ট হিসেবে চাকরি নেয়।
সোমার বাবা নাসির উদ্দিন জানান, তার মেয়ে আয়েশা আক্তার সোমা অনেক মেধাবী ছিল। তার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু ডাক্তারিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে চান্স না হওয়ায় সে অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগে লেখাপড়া করে। তার স্বপ্ন ছিল ছেলে-মেয়েকে ডাক্তারি পড়াবে। নিজে ডাক্তার হতে না পারলেও সন্তানদের ডাক্তারি পড়িয়ে মানুষের সেবায় নিযুক্ত করবে। বাস দুর্ঘটনায় শিশু-সন্তান সহ তার মৃত্যুতে সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল। ছেলে আরসান ও মা সোমাকে গকুলনগর ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।